হঠাৎ একদিন রাজবাড়িতে আবির্ভাব ঘটল এক ভাস্করের। ভাস্কর জানালেন দেবী কালিকার আদেশেই তিনি দেবীর মূর্তি গড়তে এসেছেন। জানুন পুরো কাহিনী-

0
563

বহুদিন আগের কথা। এখনকার শেওড়াফুলি তখন সাড়াপুলি নামেই পরিচিত ছিল। ভাগীরথীর তীরে এই সাড়াপুলিতেই স্থাপিত হয়েছিল নিস্তারিণী কালী মায়ের মন্দির। মন্দির থেকে ভাগীরথীর দূরত্ব হাঁটাপথে মিনিট খানেক। ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে, বাংলা ১২৩৪ সনের জ্যৈষ্ঠ মাসের কোনও এক শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শেওড়াফুলি রাজবংশের রাজা হরিশ্চন্দ্র রায়। মন্দিরের দেয়ালে পাথরের ফলকে লেখা আছে –
বর্ধমান জেলার অন্তর্ভুক্ত পাটুলির দত্ত রাজবংশজাত সাড়াপুলি বা শেওড়াফুলি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা
“ক্ষত্রিয়রাজ” রাজা মনোহর রায়ের পুত্র রাজা রাজচন্দ্র রায়
রাজচন্দ্রের প্রপৌত্র রাজা হরিশ্চন্দ্র রায়
১৮২৭ খৃঃ (১২৩৪ সালে জ্যৈষ্ঠ মাসে)Image result for nistarini kali image sheoraphuli

গঙ্গার তীরবর্তী তাঁর নিজ রাজ্যে পঞ্চমুণ্ডী আসনে শিবপত্নী দক্ষিণকালিকা শ্রীশ্রী নিস্তারিণী মাতার পাষাণময়ী মূর্তি তথা মন্দির ও সেবা প্রতিষ্ঠা করেন। উক্ত দেবসেবা ও মন্দির পরিচালনার সম্পূর্ণ তত্ত্বাবধায়ক শেওড়াফুলি রাজপরিবার।

রাজা হরিশ্চন্দ্র রায়ের মন্দির নির্মাণের পেছনেও রয়েছে একটি অদ্ভুত গল্প। লোকমুখে শোনা যায়, হরিশ্চন্দ্র ছিলেন পরম ধার্মিক, নিষ্ঠাবান ও দেবী কালিকার ভক্ত। কিন্তু তিনি একবার স্ত্রী হত্যার দায়ে জড়িয়ে পড়েন। অনুতপ্ত ও অনুশোচনায় জর্জরিত রাজা কাউকে কিছু না জানিয়েই বেরিয়ে পড়লেন আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে। কোনও এক অজ্ঞাত কারণে রাজার আর আত্মহত্যা হয়ে ওঠেনি।

ঘুরতে ঘুরতে রাজা আশ্রয় নেন গভীর জঙ্গলের মধ্যে এক বৃক্ষতলে। ক্রমে ঘনিয়ে এল রাত। ক্লান্ত রাজা ঢলে পড়লেন ঘুমে। নিদ্রাকালে রাজা স্বপ্নে পেলেন দেবীকে। দেবী স্বপ্নাদেশ দিলেন রাজাকে। তিনি যেন গঙ্গাতীরে মন্দির ও দক্ষিণা কালীর মূর্তি স্থাপন করেন। যে শিলাখণ্ডের উপর তিনি শুয়ে আছেন সেটি দিয়েই নির্মাণ করতে হবে দেবী বিগ্রহ। হতচকিত রাজা ঘুম থেকে উঠে দেখলেন এক অদ্ভুত কাণ্ড। তিনি যার উপর শুয়েছিলেন সেটি সত্যিই একটি শিলাখণ্ড।

এরপরই রাজা ফিরে এলেন তাঁর রাজদরবারে। রাজকর্মচারীদের আদেশ দিলেন ওই জঙ্গল থেকে শিলাখণ্ডটি তুলে আনার। পরে তিনি জানতে পারলেন শিলাখণ্ডটি আসলে একখণ্ড মূল্যবান কষ্টিপাথর।

তারপরেই ঘটল আরও অত্যাশ্চর্য এক ঘটনা। হঠাৎ একদিন রাজবাড়িতে আবির্ভাব ঘটল এক ভাস্করের। ভাস্কর জানালেন দেবী কালিকার আদেশেই তিনি দেবীর মূর্তি গড়তে এসেছেন। বিস্মিত ও হতবাক রাজা এমন অলৌকিক কাণ্ড দেখে মোহিত হয়ে গেলেন। তিনি মূর্তি নির্মাণের আদেশ দিলেন। যথাসময়ে সঠিক নিয়মে গড়া হল মায়ের মূর্তি। মন্দিরে স্থাপিত হল মূর্তিটি। এরপর রাজা হরিশ্চন্দ্র মন্দিরের পশ্চিমে নির্মাণ করলেন একটি কুটির। দিনের বেশিরভাগ সময়ই তিনি কাটাতেন এই কুটিরে। শোনা যায়, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাজা এভাবেই কাটিয়েছিলেন।Image result for nistarini kali image sheoraphuli

নিস্তারিণী মায়ের মাহাত্ম্য নিয়ে আরও একটি ঘটনা মনে দাগ কাটার মত। তখনও স্থাপিত হয়নি দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দির। প্রতিষ্ঠিত হয়নি মায়ের বিগ্রহ। রাণী রাসমণি দেবী হঠাৎ একদিন স্বপ্নে দেখলেন, দেবী তাঁকে আদেশ করছেন ভাগীরথীর তীরেই মন্দির প্রতিষ্ঠার। দেবীর আদেশমতই রাণী রাসমণি ভাগীরথীর তীরে মন্দির স্থাপন করবেন বলে মনস্থির করেন। একইসাথে দেবী বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করারও মনস্থির করেন তিনি। নিজের মনোবাসনাকে বাস্তবে রূপদান করতে রাণী বজরায় প্রায় প্রতিদিনই গঙ্গাবক্ষে ঘুরে বেড়াতেন। খুঁজে বেড়াতেন মনের মত জায়গা। একদিন তিনি বজরা করে যাচ্ছিলেন শেওড়াফুলি ঘাটের দিকে। রাণী শুনেছিলেন শেওড়াফুলিতে অধিষ্ঠাত্রী নিস্তারিণী দেবী অত্যন্ত জাগ্রত।

তাই নিস্তারিণী দেবী দর্শনের উদ্দেশ্যেই রাণী পাড়ি দিলেন শেওড়াফুলির পথে। ঘাটের কাছে বজরা আসতেই রাণীমা এবং মাঝিমাল্লারা দেখলেন ঘাটের কাছে দাঁড়ানো এক কিশোরী তাদের ডাকছেন। আশেপাশের পরিবেশ নিস্তব্ধ, নির্জন। রাণীমার আদেশ অনুসারে বজরা ভিড়ল ঘাটে। কিশোরীর মনোমুগ্ধকর রূপ রাণীমাকে মোহিত করল। রাণীমা কিশোরীকে নিস্তারিণী মন্দিরে যাওয়ার পথ দেখাতে বললেন। রাণীমাকে কিশোরীটি বলল, ‘আমি তো সেখানেই থাকি গো।’ রাণীমাকে বজরা থেকে নেমে আসতে বলল সে। রাণীমাও বজরা থেকে নেমে মন্ত্রমুগ্ধের মত কিশোরীকে অনুসরণ করলেন। মন্দিরের কাছাকাছি আসতেই রাণীমাকে নিস্তারিণী মায়ের থান দেখিয়ে হঠাৎ হারিয়ে গেল কিশোরীটি।

ঘটনাটি হতভম্ব করে দিল রাণীমাকে। কিশোরীটির কথা ভাবতে ভাবতে তিনি দেবীদর্শন করলেন ও পুষ্পাঞ্জলি দিলেন। রাণী দেবীর মুখের দিকে তাকাতেই চোখ আর মনমোহিনী হাসির সাথে মিল খুঁজে পেলেন ওই কিশোরীর। রাণী রাসমণি ব্যাকুল হয়ে ভাবলেন তাহলে ওই কিশোরীই কি এই!


 

 

এবার আসা যাক মা নিস্তারিণী ও মন্দিরের বর্ণনায়। অনাড়ম্বর মন্দির। মন্দির প্রাঙ্গণে পৌঁছতে গেলে বেশকিছু সিঁড়ি ভাঙতে হয়। বড় বড় থামওয়ালা নাটমন্দির। পরে বারান্দা সংলগ্ন দেবী মন্দির। মন্দিরের সামনে হাড়িকাঠ। মন্দিরে পঞ্চমুণ্ডির আসনের উপর তামার বেশ বড় একটা পাপড়িওয়ালা পদ্ম। তার উপরেই দুহাত মাথার দিকে তোলা মহাদেবের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে মা নিস্তারিণী। কষ্টিপাথরে দক্ষিণাকালীর রূপ মনকাড়া, ত্রিনয়নী এলোকেশী। করুণা ভরা চাউনি। দেবীমূর্তি উচ্চতায় আড়াই-তিন ফুট।

মন্দিরের পেছন দিকে গেলে ডানদিকেই পড়বে ছোট্ট একটা কুঠুরি। মূল দেবীর মন্দিরকে ডাইনে রেখে গর্ভগৃহে প্রবেশ করলেই দেখা মিলবে কাঠের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত বাঁশি হাতে শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি। দু-কদম এগোলেই আবার চোখে পড়বে শ্বেতপাথরের শিবগুলি।

এখন অঙ্গনের চারপাশে তেলেভাজা থেকে শুরু করে পুজোর সামগ্রী বিক্রির দোকান। বাদ যায়নি জিলিপি থেকে শাঁখার দোকানও। জমজমাট হয়ে উঠেছে মন্দির এলাকা। বেশি ভক্ত আসেন তারকেশ্বর লাইন থেকে। অন্যান্য জায়গা থেকেও মায়ের অশেষ কৃপা লাভ করতে আসেন ভক্তবৃন্দ। সকালে এবং বিকেলে মাকে লুচিভোগ দেওয়া হয়। অন্নভোগ হয়না। সকাল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ মন্দির খুলে দুপুর দেড়টা-দুটো নাগাদ বন্ধ হয়। আবার বিকেলে মন্দির খোলে। রাত ন’টা নাগাদ বন্ধ হয় মন্দিরটি। প্রতি অমাবস্যায় মায়ের পুজো হয়। বলিও পড়ে সেদিন। মানসিকের বলিও হয়। অমাবস্যা ছাড়াও বলি হয় এখানে। তবে তার পরিমাণ খুবই কম। কালীপুজোর দিন অসম্ভব ভিড় হয় মন্দিরে।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here