দেবী সরস্বতী কে বাদ দিলেন না, এমন কথা মুখে বলবনা, আরও বিস্তারিত জানতে পড়ুন নীচের লিঙ্কে ক্লিক করে

0
1455

ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।
বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।। যা আমরা পরে অথবা শুনে বড়ো হয়েছি, এবং তার পরে যা শুনলাম,

হ্যাঁ এমনি কিছু অদ্ভুত কথা আমাদের শুনতে হলও কানে , বিশ্বাস করতে পারছিনা নিজের কান কে,

কি অদ্ভুত এই দুনিয়া, আর কি অদ্ভুত এই দুনিয়ার মানুষ, ভাবতেও কেমন করে, এমনি কিছু বিশিষ্ট মানুষের বক্তব্যে উঠে আশা কিছু বক্তব্য,

ছোট বেলায় আমাদের পুঁজ বলতে আমরা শুধু আনন্দ বুঝেছি,মা  সরস্বতীর অঞ্জলি দেওয়ার কুল খেতাম না মনে পরে ? তার পর ঘুরি লাটাই নিয়ে ছুট দূর প্রান্তে, যা আমাদের স্মৃতির পাতায় বড়ো বড়ো অক্ষরে সাক্ষী হয়ে রয়েছে, যা আমাদের প্রতিমুহূর্তে আনন্দ যোগায় বেঁচে থাকতে এবং আগামি সন্তান্দের উপদেশের আশীর্বাদ রুপ ধারন করে এগিয়ে যাওয়ার সঠিক পথে,

আর সেখানে মা সরস্বতী কে নিয়ে এমন কথা শুনতে হচ্ছে,

আমরা ভাবতে পারিনা, এবং এমন ভাবনা ভাবাতও দূরের কথা মাথাতেও আনিনা,

পড়ুন তাহলে এবার সেই কথা,

কেউ জেনে এ মন্ত্রোচ্চারণ করেন, আবার কেউ না জেনে। যাঁরা না জেনে করেন, তাঁদের জন্য বলে রাখা ভাল এই মন্ত্রের অর্থসরস্বতীর স্তন দুটো শোভা বর্ধন করছে মুক্তার হারে। যে দেবী বীণা দ্বারা রঞ্জিত হয়েছে, হাতে পুস্তক আছে। সেই ভগবতী ভারতী দেবী কে নমস্কার করি।

উফঃ, এ তো একেবারে নীল দৃশ্যের সংস্কৃত ধারাভাষ্য। তবে এ মন্ত্র শুনে যাঁরা ভ্রু কুঁচকোন, ঠোঁট বেঁকান, তাঁরা তো নিজেরাও সুন্দরী-বুদ্ধিমতী-বাগ্মী মেয়ে দেখলেও বলে থাকি, ’রূপে গুণে সরস্বতী’। যখন সরস্বতী পুজোর সকালে নাইন-টেন-ইলেভেন-টুয়েলভের মেয়েরা শাড়ি পরে খোলা চুলে বেরোয়, তখনও এই ব্যাখ্যাটাই তো করে থাকি। তখন অবশ্য গুণ কম, রূপ আগে। আরে দাদা, ‘পহেলে তো দর্শনধারী’।যাঁরা এই মন্ত্র লিখেছেন, তাঁরাও সরস্বতীর আগে রূপ বর্ণণা করেছেন, পরে গুণ।

বিভিন্ন পুরাণ ঘাঁটলেও দেখা যাবে, সরস্বতী একজন রূপ-সর্বস্বা মহিলা। যাঁর গুণ পরে দেখেছেন দেবতারা, আগে প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁর রূপ। এতটাই সুন্দরী যে ত্রিদেব তো তাঁর রূপ দেখে একেবারে কুপোকাত্। মুনি-ঋষিরাও নিজেদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন না, আবার অমৃত কুম্ভ ছিনিয়ে নেওয়ার সময় দেবতারা তাঁর রূপকেই মূলধন করছেন।

একটি মত বলছে, তিনি সূর্যের কন্যা বা সরস্বান্। আরেকটি বলছে, তিনি ব্রহ্মা কন্যা। আবার আরও একটি মতে, তিনি কামদেবের কন্যা। এই তিনটি মতকেই যদি এক সঙ্গে ধরে নেওয়া হয়, তিনি ‘হট’ (সূর্য এবং ব্রহ্মা কন্যা) এবং অবশ্যই ‘সেক্সি’ (কামদেবের কন্যা)। এই ব্যাখ্যাটা একটু মজা করেই দেওয়া হল। পদ্মপুরাণ অনুযায়ী, তিনি দক্ষের কন্যা। তবে সরস্বতী কিন্তু মোটেই ‘ওয়ান ম্যান ওম্যান’ নন। তিনি শতপথে এবং অর্থবেদে ইন্দ্রের শয়ন-সহচরী বা শয্যাসঙ্গিনী। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে তিনি নারায়ণ-পত্নী। স্কন্ধপুরাণ ও শিবপুরাণে তিনি আবার শিবপত্মী। পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, তিনি আবার ব্রহ্মারও পত্মী। পদ্মপুরাণে তিনি কশ্যপ-পত্মী। আবার মনু এবং দধীচিও তাঁকে স্ত্রী বলে দাবি করেন।

এবার আসা যাক, তাঁর রূপের ছলনার কথায়। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ মতে, তিনি কৃষ্ণকেও বাসনায় আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। পৌরাণিক বৃত্তান্ত অনুযায়ী একবার যাজ্ঞবক্ল্য ঋষির সামনে তিনি ধ্যানমূর্তিতে উদ্ভাসিত হয়েছিলেন। সেদিন তাঁর গায়ে ছিল স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণের অলঙ্কার। (এরকম রূপ দেখে যাজ্ঞবল্কের অবস্থা কী হয়েছিল, তা মনে করেই শিহরণ হচ্ছে। এই গল্প শুনে অনেকেরই হয়ত যোগ দিবসে পুনম পাণ্ডের কথা মনে পড়ে যাবে।) শুধু কি তাই, পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, অমৃতভাণ্ড যখন অসুররা চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল, তখন সরস্বতী রূপের ছলনা করেই কুম্ভ ছিনিয়ে এনে ছিলেন।

পল্লব সেনগুপ্ত তাঁর ‘পূজা পার্বণের উত্সকথা’-য় লিখছেন—‘সরস্বতী প্রসঙ্গে যত ধরনের কাহিনি প্রচলিত আছে, তাদের প্রায় কোনোটির মধ্যেই তিনি যে চারিত্রিক বিশুদ্ধির প্রতিমূর্তিস্বরূপা—এমন ভাবার অবকাশ বিশেষ নেই। এই প্রসঙ্গটি একটু বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য। পুরুষ-দেবতাদের মধ্যে অনেকেই শ্লথ বিচিত্ররূপে চিত্রিত হলেও—ব্রহ্মা-ইন্দ্র, শিব-কার্তিক প্রমুখ, স্মরণযোগ্য-স্ত্রীদেবীদের মধ্যে লক্ষ্মী বা কমলা ছাড়া আর কারুকেই এভাবে বহুচারিণীর রূপে কল্পিপা হতে দেখি না।’

তবে গোঁড়া হিন্দুরা আরও একটি ব্যাখ্যা দেন। তাঁদের মতে সরস্বতী বন্দনার পরিবর্তন আনা হয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। যে মন্ত্রটি দিয়ে এখানে লেখা শুরু করেছিলাম, অর্থাত্

 

ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।

বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।।

এই মন্ত্রের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তাঁরা বলছেন, অল্পবিদ্যাধারী হিন্দুবিদ্বেষীরা এইসব বিকৃতি ঘটিয়ে আসছে সেই আকবরের সময়কাল থেকে। যাতে কিছু হিন্দুদের ব্রেণওয়াশ করে তাদের ধর্মান্তকরণ করা যায়।

সম্ভবত হিন্দুবিদ্বেষীরা এখানে কোনো বাংলা অভিধান থেকে ‘কুচযুগ’শব্দের অর্থ “স্তনযুগল” বের করেছে। কিন্তু সংস্কৃত ব্যাকরণের জ্ঞান না থাকাই বিকৃতিটিকেও ঠিকভাবে করতে পারেনি, খুব সহজে তাদের এই বিকৃতি ধরা পড়ে। উক্ত যে মন্ত্রটিকে ওরা বিকৃত করছে, তা একমাত্র আমাদের বঙ্গভূমিতেই কেবল প্রচলিত আছে।

এখানে ‘কুচযুগশোভিত’-তে ৩টা শব্দ যুক্তাক্ষরের দ্বারা যুক্ত হয়ে আছে। যথা – কুর্চ+যুগঃ+শোভিত, এখানে ‘কুর্চ’ শব্দের ‘রেফ’ টি যুক্তাক্ষরের সময় লোপ পেয়ে হয়েছে ‘কুচ’, কিন্তু এখানে মূল শব্দটি হল ‘কুর্চ’। সুতরাং, উক্ত মন্ত্রের শুদ্ধ অনুবাদ নিম্নরূপ-

(মন্ত্র)
ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।

বীনারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।।

(শব্দার্থ)
(ওঁ)পরমাত্মা/ঈশ্বর (জয় জয়)জয় জয়কার (দেবী)দেবী (চরাচর সারে)সর্ব্ব্যাপি, (কুর্চ)বৃদ্ধা ও মধ্য অঙ্গুলির অগ্রাংশ (যুগ)দীপ্তিময় (শোভিত)শোভাবর্ধক (মুক্তাহারে)মুক্তো মালা দ্বারা। (বীণারঞ্জিত)বীণা দ্বারা রঞ্জিত (পুস্তক হস্তে)পুস্তক হাতে,(ভগবতী)নারীরূপী পরমাত্মা/ঈশ্বর (ভারতী)বাণী (দেবী)দেবী (নমহস্তুতে)করজোড়ে প্রণাম।।

(ভাবার্থ)

সর্ব্ব্যাপী পরমাত্মারূপী দেবীর জয়,যাহার অঙ্গুলির অগ্রাংশ দীপ্তিময় মুক্তোমালা দ্বারা শোভিত। যিনি বীণা দ্বারা রঞ্জিত, হস্তে পুস্তক(বেদ) ধারণকারী,সেই পরমাত্মারূপী বাণীদেবীকে করজোড়ে প্রণাম।”

তবে এই ব্যাখ্যার পর একটাই প্রশ্ন ওঠে, আমাদের বেদ-পুরাণে দেবী সম্পর্কে যা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তাও কি মোগল আমলের? যদি তা না হয়, তাহলে এই ব্যাখ্যাও ধোপে টেকে না।

 

ঋণ স্বীকার : পূজা পার্বণের উত্সকথা-পল্লব সেনগুপ্ত

দেবী সরস্বতীকে নিয়ে একটি মিথ্যাচারের পর্দাফাঁস-সমীরকুমার মণ্ডল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here